Main Menu

পবিত্র ঈদুল আযহার তাৎপর্য, পশুর চামড়ার সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষা

:: মুফতী ফয়জুল হক জালালাবাদী ::

বর্ষ পরিক্রমায় প্রতি বছর আমাদের কাছে হাজির হয় ঈদুল আযহা। অনেকেই এ সময় উজহিয়া তথা পশু কোরবানী করে থাকে। কোরবানী কেবল পশু জবাই করার নাম নয়, বরং তা হলো একটি মহান ইবাদত। জানা কথা, যে কোন ইবাদত মহান রাব্বুল আলামীনের দরবারে মকবুল ও গৃহীত হতে হলে বিশুদ্ধ তরীকায় তথা শরীয়ত নির্ধারিত নিয়মে আদায় করতে হয়। তাই কোরবানী করার পূর্বেই আমাদেরকে কোরবানীর মাসআলা-মাসায়িল জেনে নেয়া অপরিহার্য।
আল্লাহ তা’আলা কোরবানীর মাধ্যমে বান্দাদের কাছে যা চান তা হলোঃ- আল্লাহ পাক কালামে বলেনঃ কোরবানী করা আল্লাহ তা’আলার নিদের্শ ও একটি প্রিয় বিষয় হলো, তার কাছে কোন পশুর গোশত ও রক্ত পৌছে না। বরং তোমাদের তাকওয়াই তার নিকট পৌছে।
হ্যাঁ, আপনার মনের ভিতরে কতটুকু আল্লাহ ভীতি আছে, তাঁর প্রতি কতটুকু ভালোবাসা আছে, তাঁর হুকুমের প্রতি আপনার কতটুকু সম্মান ও শ্রদ্ধা আছে, আদেশ প্রতিপালনে আপনার অন্তরে তাঁর জন্য কতটুকু বিনয় ও আনুগত্যের ভাব বিদ্যামান আছে, তা-ই তিনি দেখে থাকেন। আর এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা অতি মেহেরবানী করে ইবাদত-বন্দেগীর বাহ্যিক ক্রিয়াদি ও আভ্যন্তরিন অবস্থাকে পুরোপুরি দুরস্ত করার শিক্ষা প্রদানের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
বলুন হে রাসূল (সাঃ)! নিশ্চয় আমার নামায, কোরবানী ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগী, আমার জীবন ধারণ এবং আমার মৃত্যু কেবলমাত্র আল্লাহ তা’য়ালারই উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয়।
অন্য হাদীসে আছে- আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনা মনোয়ারায় দশ বর্ষ বাস করেছেন এবং প্রত্যেক বছরই কোরবানী করেছেন।
উক্ত হাদীস দ্বারা কোরবানীর গুরুত্ব কতটুকু, এর প্রতি আল্লাহর নবী (সাঃ) কতখানী যত্নবান ছিলেন এবং এ ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর করণীয় কর্তব্য কি, তা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ হাদীস শরীফ দ্বারাই কোরবানী করা ওয়াজিব প্রমাণিত হয়ে যায়।
অন্য হাদীসে আছে- কোরবানী দিবসে বনী আদমের কোন আমলই আল্লাহ তায়ালার নিকট কোরবানীর রক্ত প্রবাহের চেয়ে প্রিয় নয়। আর কোরবানীর পশু কেয়ামতের দিন তার শিং, লোম, খুর ইত্যাদি সহ উঠে আসবে; আর কোরবানীর পশুর রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে কবুল হয়ে যায়। অতএব, তোমরা সানন্দে কোরবানী কর। পবিত্র ঈদুল আযহার পশু কোরবানীয় একটি এবাদত হিসাবে গণ্য। আর প্রত্যেক এবাদতেরই সারকথা ও উদ্দেশ্য আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টি লাভ করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবাদতের বিশেষ বিশেষ পদ্ধতি, স্তর, রীতি-নীতি ও প্রক্রিয়া পালনের মাধ্যমে বান্দারই বিশেষ বিশেষ অভ্যাস ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও উপকার হয়ে থাকে। যেমন, যাকাত আদায় করলে আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্টি হন। কেননা, তাঁর আদেশ পালিত হয়।
মানুষ কোরবানীর পথে আল্লাহ তা’য়ালার রেজামন্দী যেমন চূড়ান্তভাবে অর্থাৎ মানুষের সামর্থ ও স্তর অনুযায়ী অর্জন করা যায়। তেমনি মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক স্বার্থ রক্ষিত হয়ে থাকে। তা থেকে দুয়েকটি বর্ণিত হল ঃ
(১) পশু কোরবানীর মাধ্যমে যেন আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর রাসূল (সাঃ) মুসলিমদেরকে এ কথাই বলেন থাকেন, হে “মুসলিম লোকজন! আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির জন্য তোমরা নিকৃষ্ট জীবের শোনিত প্রবাহিত করে চলছে। ভাল কথা, কোনদিন যদি এমন হয় যে, তোমাদের নিজেদের কে আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার প্রয়োজন পড়ে, তখন যেন পিছপা না হও! ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) এর মত দৃঢ়-সংকল্প ও অটল ধৈর্য নিয়ে গলা কাটানোর দিকে এগিয়ে যেও। তাহলেই চূড়ান্তভাবে কামিয়াব হতে পারবে”।
(২) পশু কোরবানী দ্বারা আমাদের জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর স্মৃতি রক্ষা করা।
(৩) কোরবানী বা ঈদুল আজহার খুশীতে গরীব, মিসকীন, ফকীর ও ভুখা-নাঙ্গা মানুষকে শরীক করা হয়। তদুপরি, ঈদুল ফিতরেও সদকায়ে ফিতরের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ, ঈদ দু’টি মুসলিম উম্মাহর সার্বজনীন আনন্দোৎসব। আর শুধুমাত্র সম্প্রদায়ের এক শ্রেণীর মানুষের আনন্দ ফুর্তি দ্বারা আনন্দ জমে উঠার কথা নয়, তাই এ ব্যবস্থা।
(৪) কোবানীর ব্যবস্থা দ্বারা অনাহারী, ভুখা, নাঙ্গা মানুষের জন্য একটু আমিষ জাতীয় খাদ্য-গোশতের ব্যবস্থা করা হয় এবং ধনী সম্প্রদায়ের এ অভ্যাস গড়ে তোলা হয় যে, গোশত ও উন্নত খাদ্য আহার করার সময় প্রতিবেশি সহ অনাহারীর কথা স্মরণ করে তাদেরকে কিছু অংশ দেয়া হোক।
(৫) মহাসঙ্কটের দিনে হাশরের ময়দানে কল্পনাতীত দূরত্ব অতিক্রম করতে যখন মানুষের জন্য কোন বাহন থাকবে না বা কোন মুদ্রা বিনিময়ও চলবে না এবং তার চেয়েও গুরুতর পুলসিরাতের অতি সুক্ষ্ম সাকো পার হয়ে যেতে হবে, অসহায় হয়ে তখন মানুষকুল কেউ কোন দিকে তাকাবে না, এমনকি পিতা-মাতা, স্ত্রী-পুত্র সামনে থাকলেও একটি মুখের কথাও বলতে চাইবে না। এমন দিনে কোরবানীর পশুটি তার একান্ত সুহৃদ বন্ধু হিসেবে তাকে পৃষ্ঠে আরোহণ করিয়ে হাশরের ময়দানে পৌঁছে দেবে। কোরবানীর মাধ্যমে ধনীদের অন্তর থেকে পশু প্রীতি হ্রাস করে দেয়া হয়। কেননা, নিজ হাতে যখন একটি সুস্থ সবল পশুকে জবেহ করে ভক্ষণ করবে, তখন অবশ্যই এ জীবগুলোর প্রতি অন্ধ মোহ টুটে যাবে। যে মোহ একটি সম্প্রদায়কে পশু পূজা করাতে পর্যন্ত সক্ষম হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) -এর দ্বারা আল্লাহ তায়ালার ফরমাবরদারীর মত প্রত্যেক মুসলিম প্রতিটি ফরজ কাজে যেমন নামায, রোযা, হজ্ব যাকাত, ইত্যাদিতে আল্লাহ তা’য়ালার ফরমবরদারী করার শিক্ষা কোরবানী দিয়ে থাকে।

কুরবানীর মড়া সংরক্ষণঃ
* কুরবানীর চামড়া বিক্রয় না করিয়া জায়নামায ইত্যাদি বানাইয়া নিজের কোন স্থায়ী কাজে লাগানো যাইতে পারে, অথবা কাহাকে হাদিয়াও দেওয়া যাইতে পারে, অথবা গরীব-মিসকীনকে দান করাও যাইতে পারে। (শামী)।
* কুরবানীর চামড়া বিক্রয় করিলে উহার মূল্য (বিনিময়) গরীব-মিসকীনকে ছদকা করা ওয়াজিব। (শামী)
* কুরবানীর চামড়ার মূল্য কোন মালদার ব্যক্তিকে অথবা সরাসরিভাবে মসজিদ বা অন্য কোন সৎকাজে ব্যয় করিলে জায়েয হইবে না। অসহায় গরীব মানুষকে দিতে হইবে। (শামী)
* কুরবানীর গোশত বা চামড়া অথবা চামড়ার পয়সা দ্বারা যবেহ করাইবার বা গোশত কাটানোর পারিশ্রমিক দেওয়া জায়েয নহে। (শামী)
* কুরবানীর চামড়া সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ বিপনন ও ব্যবসার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও মানব সম্পদ উন্নয়নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষাঃ
পবিত্র কোরবানীর পশুর চামড়া অথবা তার টুকরা অংশ যেখানে সেখানে ফেলিতে পারিবেন না তাতে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পরিবেশ দূষিত হবে। ইসলাম বলেছে “আততুহুরু শাতরুল ঈমান” পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ বিধায় কোরবানীর পশুর চামড়ার অপ্রয়োজনীয় অংশ উজুড়ী এবং মলমুত্র সহ যাবতীয় বর্জ নির্ধারিত স্থানে ফেলতে হবে যাতে করে কোন অস্থাতেই রাস্তা-ঘাট ও পরিবেশ পরিস্থিতি ভারসাম্যহীন হয়ে না পড়ে এবং যথাযথ সঠিক পরিবেশ বজায় থাকে। আমরা সকলেই সামাজিকভাবে সচেতন হলে অবশ্যই কোরবানীর চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ ও দুষণ মুক্ত পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষা করা অবশ্যই সম্ভব হবে।
তাই আসুন আমরা সকলে মিলে মিশে দলবদ্ধভাবে পবিত্র ঈদুল আযহার কোরবানীর পশুর চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রক্ষার জন্য একান্তভাবে সচেষ্ট হই। এটা আমার আপনার সকলের ইমামী ও সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে শুভ কাজের সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের তাওফিক দান করুন। এবং স্বীয় মেহেরবাণীতে আমাদেরকে ঈমানে কামিল দান করে তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন। (আমীন)

লেখক, গ্রান্ড ইমাম, ইমরাতে শরীয়াহ বাংলাদেশ, প্রিন্সিপাল- জামিয়া ফয়জুল উলুম, সিলেট।






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *