Main Menu

প্রচলিত সুশাসন তত্ত্ব ও ব্যর্থার পয়েন্ট

॥ মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান ॥

নৈতিকতা ও মূল্যবোধের উৎস নিয়ে তর্ক বহুদিনের। ধর্মই নৈতিকতার একমাত্র উৎস কিনা, তা নিয়ে অনেক গবেষণা ও লেখালেখি হয়েছে। পশ্চিমা চিন্তাবিদদের মতে আধুনিক সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বুদ্ধিবৃত্তি। এ বুদ্ধিবৃত্তি মূলত ব্যবহারিক জীবনের হাতিয়ার স্বরূপ। প্রচলিত এ বুদ্ধিবৃত্তি সমাজ গঠনে ঐশী বিধানের বিরোধিতা করে থাকে এবং ধর্মীয় নৈতিকতার আবেদন অস্বীকার করে মানুষকে স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টা করে। সে হিসেবে আধুনিক সমাজজীবনে ধর্ম সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকৃত বিচারে তৃতীয় সহস্রাব্দে আমরা ধর্মের লক্ষণীয় অগ্রগতির মুখোমুখি হচ্ছি।
প্রচলিত বুদ্ধিবৃত্তির মতবাদ কেবল মানুষের বস্তুগত চাহিদা পূরণ করছে। পাশাপাশি এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়-অনাচার, আত্মকেন্দ্রিকতা, মানবিক দায়িত্বহীনতা, ধ্বংসকামী উন্নয়ন ইত্যাদি আধুনিক মানুষকে নিরর্থক এক সত্তায় পরিণত করছে। তাই, বর্তমানে অনেক সমালোচক এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি ও মতবাদ মানুষের নৈতিক ও সামাজিক জীবনোপযোগী কাঠামো উপস্থাপনে অক্ষম।
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্নতায় জাতিগত সংস্কৃতি ও সভ্যতা ভিন্ন হয়ে থাকে। কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণে আমরা দেখতে পাই যে, সর্বজনীন সকল ভালো ও মন্দের সংজ্ঞা ধর্ম থেকে উৎসারিত। বিষয়টি ভালোভাবে অনুধাবনের জন্য ধর্ম, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির আলোকে আমরা সমাজে প্রচলিত কিছু অপরাধ এবং কর্মকাণ্ডকে বিশ্লেষণ করতে পারি।
এখন প্রচলিত বিশ্বাসে নির্ধারিত এ চারটি কর্মের বিশ্লেষণ যদি আমরা করি, তাহলে দেখতে পাই- যে চুরি করে, তার ব্যক্তিগত কোন ক্ষতি হয় না। বরং আর্থিক বিবেচনায় সে লাভবান হয়ে থাকে। অসংখ্য অকাট্য দলিল উপস্থাপন করা যাবে যে, চুরি করার কারণে একজন চোর ব্যক্তিগতভাবে কোন বিবেচনাতেই বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় না। কেবল আইন যে সকল ধরনের অপরাধ দমন করতে সক্ষম নয়, সে বিষয়ে আমরা পূর্বেই পশ্চিমা দার্শনিক আর. এম. ম্যাকাইভার এর স্বীকারোক্তি উল্লেখ করেছি। এমতাবস্থায়, ধর্ম কেবল ধর্মই এবং ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে উৎসারিত নৈতিকতাই পারে একজন মানষকে প্রতিক্ষণ এ কর্মকাণ্ড থেকে বাঁচিয়ে রাখতে। চুরির সংজ্ঞা থেকেই শুরু করে সকল পর্যায়ে এর বিপরীত প্রভাব বর্ণনায় যেহেতু ধর্মের উপস্থিতি রয়েছে, তাই সর্বজনীন অপরাধ হিসেবে এটি সকল সমাজে স্বীকৃতি লাভ করেছে।
ব্যভিচারের বিষয়টিও প্রায় কাছাকাছি। এটি সকল ধর্মমতে গর্হিত অপরাধ। তাই, একইসাথে এটি সকল সমাজেও স্বীকৃত অপরাধ হিসেবে পরিগণিত। প্রচলিত সুশাসন প্রত্যয়ের ব্যর্থতা পয়েন্টে আমরা উল্লেখ করেছি যে, সুশাসন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠাকারী দেশসমূহ ব্যভিচারেও রয়েছে প্রথম সারিতে!
আমরা যদি এবার বাল্য ও বিধবা বিবাহের দিকে দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে দেখতে পাব- প্রথমটির যাবতীয় তত্ত্ব পশ্চিমের দেশ থেকে আমদানিকৃত। সর্বজনীনভাবে বাল্যবিবাহের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা একটি বিবেচনাহীন কাণ্ড বৈ কিছু নয়। এটির সংজ্ঞা নির্ধারণে ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা দেবার সক্ষমতা, জলবায়ু ইত্যাদি বিষয়কে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা আবশ্যক ছিল। প্রচলিত বাল্যবিবাহের সংজ্ঞায় যেহেতু ধর্মের সরব উপস্থিতি নেই, তাই এটি সকল মানুষ ও সমাজের কাছে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এ কর্ম যারা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছেন, তারা কোন ধরনের অপরাধবোধে ভোগেন না। আবার এটিকে ঢালাওভাবে যদি আমরা অপরাধ স্বীকার করে নিই, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকারী কোন রাষ্ট্র কি তাদের সুশাসন তত্ত্ব দিয়ে তাদের রাষ্ট্রে কিশোরীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারছে? বিধবা বিবাহ একটি নিকৃষ্ট কর্ম- এ ধারণাটি মূলত কোন ধর্ম থেকে প্রসবকৃত নয়; এসেছিল হিন্দু আইন থেকে। কিন্তু বিধবা বিবাহ যে একটি সামাজিক প্রয়োজন, তা তো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এ বিষয়ক আন্দোলন থেকেই আমরা বুঝতে পারি। ফলে ১৮৫৬ সালে উপমহাদেশে বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।
সামগ্রিক আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ধর্মই হলো টেকসই নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সর্বজনীন, প্রথম ও প্রধান উৎস। মানুষ সৃষ্টির প্রথম থেকেই ধর্ম ছিল, তাই ধর্মই মানুষের ভেতর কোনটি ভালো- কোনটি মন্দ সে বোধ প্রথম জাগ্রত করেছে। কালক্রমে মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতির ক্রমবিকাশের পথে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার উৎস হিসেবে অনেক কিছু স্বীকৃত হলেও ধর্মই ছিল মানুষের বোধ ও বোধোদয়ের সূচনাকারী উৎস।
সুশাসনের পথ মসৃণ নয়; কণ্টকাকীর্ণ। এ পথে রয়েছে বহু বাধা। যেমন- ধর্মহীনতা, ধর্মীয় শিক্ষার অভাব, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, সমাজের ভারসাম্যহীনতা, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা, জবাবদিহির অভাব, আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বাক-স্বাধীনতায় হুমকি, রাজনীতিতে সামরিক ছায়া, দুর্বল আইন বিভাগ, বিচার বিভাগের পরাধীনতা, রাজনীতিতে জনঅংশগ্রহণের অভাব, সাংঘর্ষিক রাজনীতির প্রবণতা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অঙ্গীকারহীনতা, গণতান্ত্রিক চর্চায় অনাগ্রহ, আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের সংকীর্ণ কর্মপরিধি, সুযোগ্য নেতৃত্বহীনতা, জনস্বার্থ ও জনকল্যাণ বাস্তবায়নে আন্তরিকতার ঘাটতি ইত্যাদি। উল্লিখিত যাবতীয় সমস্যা ও প্রকৃত সুশাসনের অভাব বিশেষ করে অনুন্নত রাষ্ট্রগুলোকে ঠেলে দিয়েছে এক চরম বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে। বাংলাদেশও তার বিপরীত নয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো হলেও প্রকৃত সুশাসনের বাস্তবায়নে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে।
লেখক: কলামিস্ট ও গবেষক, সিলেট।





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *